জীবন যুদ্ধে দুই নারী কামারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ

বর্তমান খবর,বরগুনা প্রতিনিধি :
জেলার আমতলীতে দুই নারী ব্যতিক্রমী পেশা কামারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ঝুমা কর্মকার ও পুতুল কর্মকার নামের দুই জা’ আমতলী শহরে কামারের কাজ করছেন কয়েক বছর ধরে। শহরের সদর রোডে তাদের পারিবারিক কামারশালাটি অবস্থিত। সমগ্র জেলায় নারীদের জন্য এ পেশায় তারাই কেবল মাত্র নারী।

আমতলী উপজেলা শহরের আশীষ কর্মকার ও অসীম কর্মকার দুই ভাই মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে এক প্রকার অনন্যোপায় হয়েই ধুমা ও পুতুল এ পেশায় আসেন। প্রতিদিন পুরুষ কামারের মতো যুদ্ধ করেন আগুন ও লোহার সাথে। ধরে রেখেছেন বংশ পরম্পরায় পেশাটিকে। সংসারে এনেছেন স্বচ্ছলতা। তারা জানিয়েছেন, করোনা ভাইরাসের কারনে বেচাকেনা কম থাকলে কোরবাণীর ঈদ উপলক্ষে কাজ ও বিক্রি বেড়েছে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আমতলী পৌর শহরের সদর রোডে দুই ছেলে আশীষ কর্মকার ও অসীম কর্মকারকে নিয়ে শ্যাম কর্মকারের কামারশালাটিবেশ জমজমাট ছিল। গত ৬০ বছর ধরে পারিবারিকভাবে এ কাজের সাথে জড়িত তিনি। ২০১০ সালে শ্যাম কর্মকারের বড় ছেলে আশীষ কর্মকার মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। ২০১২ সালে মারা যায় সে।। বিধবা হয়ে পড়ে তার স্ত্রী ঝুমা কর্মকার। বৃদ্ধ শ^শুর ও দেবর অসীম কর্মকারের পাশাপাশি কামারশালায় কামারের কাজে সহযাগিতা শুরু করেন বিধবা ঝুমা।

কিছুদিন পরই ফুসফুস ক্যান্সারের আক্রান্ত হয় অসীম কর্মকারও। দুই ছেলের চিকিৎসায় যথাসর্বস্ব হারিয়ে ফেলেন শ্যাম কর্মকার। ৫ বছর ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে ২০১৯ সালে ৫ নভেম্বর অসীমও মারা যায়। দুই ছেলেকে হারিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন বৃদ্ধ বাবা শ্যাম কর্মকার (৮০)। এমনই মূহুর্তে দুই ছেলের দুই বিধবা স্ত্রী ঝুমা রানী কর্মকার ও পুতুল রানী কর্মকার স্বামীর পরিবারে হাল ধরতে বন্ধ হয়ে যাওয়া তাদের কামারশালায় পুরুষের মতো কাজ শুরু করেন।

কারিগরের পাশাপাশি নিজেরা শারীরিক শ্রম দিয়ে প্রতিদিন দা, বটি, কুঠার, হাতুড়ি, ছেনা, চাকু ও খুন্তিসহ লোহার জিনিস পত্র তৈরি করছেন। আগুন এবং লোহার সাথে এ দুই বিধবা নারীর গভীর মিতালীতে কামারশালা থেকে হওয়া আয় দিয়ে তাদের ৭ সদস্যের পরিবারের জীবিকা চলছে। শশুর শ্যাম কর্মকার বর্তমানে বয়সের ভারে ন্যুজ¦। চোখে কম দেখেন, সারা শরীরের ফোসকা পড়ে চামড়া উঠে যাচ্ছে। বৃদ্ধ শশুর-শাশুড়ীর চিকিৎসা, ভরন-পোষণ, দুই বিধবা নারীর দুই সন্তান অন্তু কর্মকার ও অন্তরা কর্মকারের লেখাপড়া ও ননদের দেখভাল চলে এ কাজে অর্জিত অর্থ দিয়েই।

নারী কামার পুতুর রানী কর্মকার জানায়, স্বামীর ঐতিহ্য ধরে রাখতে দুই জা’য়ে কাজে লেগে পড়ি। দিন রাত লোহা ও আগুনের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছি। সংসারতো চালাতে হবে। ঝুমা রানী কর্মকার জানিয়েছে, যতদিন শক্তি সামর্থ আছে ততদিন স্বামীর ঐতিহ্য ধরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাব।

আমতলীর ব্যবসয়িী সমিতির সভাপতি হারুন অর রশিদ হাওলাদার জানান, ঝুমা ও পুতুল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমি একটি পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। সমগ্র জেলায় তারা ছাড়া আর কোন নারী কামার নেই।

আমতলী উপজেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মতিয়ার রহমান জানান, দুই বিধবা নারী স্বামীর ঐতিহ্য কামার শিল্পকে ধরে রাখতে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পেলে তারা এ পেশায় আরও উন্নতি করতে পারতেন।

আরও পড়ুন
Loading...