কালো রং ধারন করেছে শীতলক্ষ্যার পানি !

বর্তমান খবর,রাজীব প্রধান :
দূষণে নদীর স্বাভাবিক পানি কালচে হয়ে উঠেছে, ভেসে যাচ্ছে পলিথিনে মোড়া বর্জ্য । অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে গেছে শীতলক্ষ্যা নদী। স্বচ্ছ পানি কালচে রঙ ধারণ করেছে। সঙ্গে আছে দুর্গন্ধ। কুচকুচে কালো আর উৎকট দুর্গন্ধের পানি ব্যবহার তো দূরের কথা,নদী পথে চলাচলই এখন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

পরিবেশ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী,প্রতিদিন শুধু অপরিশোধিত ১৫ কোটি লিটার শিল্প বর্জ্য বিভিন্ন খাল-বিল দিয়ে এসে শীতলক্ষ্যায় পড়ছে। এছাড়াও বিভিন্ন পয়ঃনিষ্কাশন ও গৃহস্থালী বর্জ্য,পলিথিন,বাজারের উচ্ছিষ্ট অংশ,হোটেল রেস্তোরাঁর বর্জ্যসহ আরও কয়েক কোটি লিটার বর্জ্য এসে মিলে শীতলক্ষ্যায়।

শ্রীপুর উজেলার উল্লেখযোগ্য নদী শীতলক্ষ্যা,শীতলক্ষ্যা নদীর মাধ্যমে শ্রীপুর ও কাপাসিয়া উপজেলা দ্বী-খন্ডিত হয়েছে। নদীর দুই তীরে পানি উন্নয়ণ বোর্ড কর্তৃক বেড়ী বাধ নির্মাণ করা আছে। শীতলক্ষা দৈর্ঘ্য ২৩০.১২ কিলোমিটার। শীতলক্ষ্যা নদীর দুইটি শাখা নদী রয়েছে ১। সুতিয়া, ২। মাটি কাটা নদী। এটি গাজীপুর সদর হয়ে,কালিগঞ্জ উপজেলা মধ্য দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে মিলিত হয়েছে। এক সময় এ নদীই ছিল শ্রীপুর উপজেলায় যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। বর্তমানেও সীমিত আকারে শীতলক্ষা নদীর মাধ্যমে একস্থান থেকে অন্যস্থানে মালামাল পরিবহণ করা হয়। বর্তমানে এই শীতলক্ষা নদীর পানি দ্বারা কৃষিকাজ করা হয়। অধিকন্তু এই নদীতে অনেক মাছ পাওয়া যায়।

শীতলক্ষ্যা সেচ প্রকল্পের পরিচালক ও ব্যবস্থাপক বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জনাব নুর মাস্টার ফকির তার একান্ত সাক্ষাৎকারে শীতলক্ষ্যা নদীর বিষয়ে বর্তমান খবরকে জানান,পরিবশে অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে,শীতলক্ষ্যার দুই পারে দুই হাজারেরও বেশি শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। আর এর মধ্যে তরল বর্জ্যে নির্গমনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে পাঁচ শতাধিক। এর মধ্যে শিল্প-কারখানাগুলোতে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) রয়েছে ৪০৭টি প্রতিষ্ঠানের। তবে ব্যবহার করছে ৩০১টি প্রতিষ্ঠান।

একদিকে দূষণ ও অন্যদিকে দখলের কবলে প্রতিনিয়ত তার জৌলুস হারাচ্ছে শীতলক্ষ্যা নদীর বেশ কয়েকটি জায়গায় দেখা গেলো- নোংরা কালো রঙের পানিতে গোসল করছেন লোকজন। কেউ কেউ কাপড় ধোয়ার কাজটিও সারেন এই পানিতেই। ফলে চুলকানি রোগটি এখানে স্বাভাবিক। একসময় শীতলক্ষ্যায় এসে বাড়ির নারীরা কলস ভরে জল নিয়ে যেত। এখন এই নদীর পানিতে হাত-পা ধোয়াও যায় না।

অনেকেই বলেন, এই নদীর পানি দিয়ে রোগ নিরাময়ের ওষুধ তৈরি হতো। এখন আধুনিক শোধনাগারে শোধন করেও দুর্গন্ধের কারণে এই পানি পানের যোগ্য হয় না। ফলে এলাকাবাসী আক্রান্ত হচ্ছে রোগে।

আগে নদীর পাড়ে দেখা যেত ফসলের ছোট ছোট ক্ষেত। নদীর পানি বিষাক্ত হওয়ায় এই পানি দিলে ফসল মরে যায়। তাই এখন নদীর পাড়ে ফসল চাষ কমে গেছে। প্রশস্ততা কমে শীতলক্ষ্যা নদী এখন খালের আকার নিয়েছে। এখন বর্ষা মৌসুমেও নদীতে জেলেদের জাল ফেলার দৃশ্য দেখা যায় না। মাছ ধরার নৌকাও বেশি দেখা যায় না। নদী আশেপাশে দেখা যায় ময়লার স্তুপ।

শীতলক্ষ্যা নদীটি গাজীপুর জেলা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা হয়ে দূরে মিলিয়ে গেছে সাগরে, শীতলক্ষ্যা নদী পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎপন্ন। গাজীপুর জেলার টোক নামক স্থানে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে একটি ধারা বানার নামে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে লাকপুর নামক স্থানে শীতলক্ষ্যা নাম ধারণ করে বৃহত্তর ঢাকা জেলার পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

শীতলক্ষ্যা কলাগাছিয়ার কাছে ধলেশ্বরী নদীতে পড়েছে। নদীটির মোট দৈর্ঘ্য ১১০ কিমি,প্রস্থ নারায়ণগঞ্জের কাছে ৩০০ মিটার,কিন্তু উপরের দিকে আস্তে আস্তে কমে গিয়ে হয়েছে প্রায় ১০০ মিটার। ডেমরায় সর্বোচ্চ ২,৬০০ কিউমেক প্রবাহ পরিমাপ করা হয়েছে। নদীটি নাব্য এবং সারা বছরই নৌ চলাচলের উপযোগী। শীতলক্ষ্যার ভাঙন প্রবণতা কম।

বাংলাদেশের এককালীন বিখ্যাত মসলিন শিল্প শীতলক্ষ্যা নদীর উভয় তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল। বর্তমানেও নদীর উভয় তীরে প্রচুর পরিমাণে ভারি শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। অধুনালুপ্ত পৃথিবীর বৃহত্তম পাটকল ‘আদমজী জুট মিল’ শীতলক্ষ্যার তীরে অবস্থিত ছিল। এই নদীর তীরে ঘোড়াশালের উত্তরে পলাশে তিনটি এবং সিদ্ধিরগঞ্জে একটি তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র অবস্থিত।

বাংলাদেশের অন্যতম নদীবন্দর নারায়ণগঞ্জ বন্দর ও শহর এই নদীর তীরে অবস্থিত। শীতলক্ষ্যা তার পানির স্বচ্ছতা এবং শীতলতার জন্য একদা বিখ্যাত ছিল। বছরের পাঁচ মাস নদীটি জোয়ার-ভাটা দ্বারা প্রভাবিত থাকে, কিন্তু কখনোই কূল ছাপিয়ে যায় না।

নদীমাতৃক বাংলাদেশ নামটি টিকিয়ে রাখতে হলে নদীর খনন করতে হবে সেই সাথে দূষন মুক্ত রাখাটাও প্রয়োজন। আদালত দেশের প্রতিটি নদীর অভিভাবক ঘোষণা করেছেন নদী রক্ষা কমিশনকে। শীতলক্ষ্যা বাঁচাতে নদী রক্ষা কমিশনের উদ্যোগ এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন
Loading...