‘অ্যাই ছাড়ো, কেউ দেখে ফেলবে“ মিনা পাল থেকে মিষ্টি মেয়ে কবরী

বর্তমান খবর : চলে গেলেন বরেণ্য অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস তাকেও কেড়ে নিলো। অবসান ঘটাল এক বিস্ময়কর অধ্যায়ের। শুক্রবার রাত ১২টা ২০ মিনিটের দিকে রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ১৩ দিনের মাথায়ই জীবনের কাছে হেরে গেলেন কিংবদন্তী এ অভিনেত্রী। অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে তার অনেক কাজ। আরও অনেক স্বপ্ন ছিল তার। দাপুটে অভিনয়ে সক্রিয় ছিলেন সিনেমায়। এরপর চলে যান ক্যামেরার পেছনে। বসেন পরিচালকের আসনেও। একটি ছবি পরিচালনার কাজও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে তার।

কিন্তু বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের প্রায় ৫৬ বছরে কম করেননি তিনি। একটি বিস্ময়কর অধ্যায় তার। ১৪ বছর বয়সে মিনা পাল নামের এক কিশোরী পেটে গামছা প্যাঁচানো পুঁটলি বেঁধে গর্ভবতী নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন,সেই থেকে সূচনা ৭০ বছর বয়সী এ কবরীর। রূপালি সুতোয় কেঁড়েছেন দর্শকের মুগ্ধ দৃষ্টি।

সুভাষ দত্ত পরিচালিত ও অভিনীত সুতরাং ছবির মাধ্যমেই বাংলা চলচ্চিত্রে নায়িকা কবরীর আবির্ভাব। ১৯৬৪ সালের ২৪ এপ্রিল মুক্তি পেয়েছিল তার প্রথম ছবিটি। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য রীতিমতো খুঁজে বের করা হয়েছিল তাকে। এই ছবিতে অভিনয়ের একটা গল্প রয়েছে। তা হলো অভিনেতা ও নির্মাতা সুভাষ দত্ত তখনও সুভাষ দত্ত হয়ে ওঠেননি।

তিনি তখন চলচ্চিত্রে পোস্টার,ব্যানার তৈরি করেন। ‘মাটির পাহাড়’(মহিউদ্দিন,১৯৫৯)-এর সহকারী পরিচালক সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সৈয়দ হককে তিনি নিজের একটি সুপ্ত ইচ্ছার কথা জানালেন। জানালেন – একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। একজন প্রযোজক তাকে ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অবশ্য তখন একটি ছবি তৈরি করতে সর্বোচ্চ ৯০ হাজার টাকা লাগতো।

এ অবস্থায় সৈয়দ হক তাকে নির্ভয় দিলেন। এরইমধ্যে সত্য সাহাকে আবিষ্কার করলেন সৈয়দ হক। এবার তিনজন মিলে ছবি তৈরির প্রাথমিক কাজগুলো করতে শুরু করলেন।

এর মধ্যে চিত্রনাট্য ও গানগুলো তৈরি হয়ে গেল। একজন নায়িকা দরকার যাকে,সুভাষ দত্তের সঙ্গে মানাবে। সুভাষ দত্ত নায়ক চরিত্র করছেন শুনে তখন অনেকেই হাসাহাসি করতেন। তারা ধরেই নিয়েছিলেন ছবিটি ফ্লপ করবে। এই চিন্তা থেকে সত্য সাহা চট্টগ্রামের এক মেয়ের খোঁজ দিলেন,তার নাম মিনা। খবর পেয়ে বাবা মিনাকে নিয়ে এলেন এই তিনজনের কাছে। বেশকিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে মিনা নির্বাচিত হলেন‘সুতরাং’ছবির নায়িকা হিসেবে।

সুভাষ দত্ত তার পর্দানাম রাখলেন কবরী। বিষয়টি নিয়ে গনমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কবরী বলেছিলেন,‘আলো ঝলমল ঢাকা শহর,মিনার চোখে স্বপ্ন। বাংলার মানুষের মনে এক চিলতে ঠাঁই করে নেওয়ার জন্য অনেক পরিশ্রম,অনেক সংগ্রাম করেছি। কত নতুন কিছু বুঝতে শিখেছি,জানতে শিখেছি। নিজেকে তৈরি করেছি। এক হাজার ১১ টাকা পুঁজি নিয়ে বাংলার সাত কোটি মানুষের হৃদয় দখল নেওয়া ছিল অনেক কঠিন কাজ।’

বাংলা চলচ্চিত্রে কাজ শুরুর পর ফিরিঙ্গি বাজারের কিশোরী মিনার নাম বদলে সুভাষ দত্ত তার পর্দা নাম রাখলেন কবরী। ধীরে ধীরে মিনার খোলস পাল্টে কবরী মোড়কে বন্দি হলেন তিনি। রূপালি পর্দার‘কবরী’হয়ে গেল জীবনের পরিচয়। ছোটবেলায় কবরী ছিলেন দুরন্ত। যে কারণে তার মা বলতেন,‘পাড়া চরনি’। সেই পাড়া চরনি যখন‘সুতরাং’ ছবির নায়িকার জন্য ইন্টারভিউ দিতে ঢাকায় এসেছিলেন,তখন প্রয়াত সুভাষ দত্ত তাকে বলেছিলেন ‘সংলাপ বলো,‘অ্যাই ছাড়ো,কেউ দেখে ফেলবে।’দেখি তুমি অভিনয় করতে পারবে কি-না?’ কবরী সেই সংলাপ ভয়ে ভয়ে দিয়েছিলেন। তার মুখে সংলাপ শুনে সুভাষ দত্ত বলেছিলেন,‘এ তো দেখি চাটগাঁইয়া গলার সুর। উহু চলবে না। কথা ঠিক করে বলতে হবে।’

কবরীকে বলা হয় বাংলা চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে। তার ভুবন ভোলানো হাসি আর হৃদয়ছোঁয়া অভিনয়ে মুগ্ধ সব বয়সী দর্শক। তিনি যখন রূপালি পর্দায় অপরিহার্য,সে সময়ে একটি কথা প্রচলিত ছিল-‘কবরী হাসলেও লাখ টাকা,কাঁদলেও লাখ টাকা। অর্থাৎ তার অভিনয় এতটাই নিখুঁত যে,তিনি বাংলার সব শ্রেণির দর্শকের কাছে পাশের বাড়ির সেই মেয়েটি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। পাশের বাড়ির মেয়েটির সুখ-দুঃখ যে কারও মনে রেখাপাত করতে পারে,যে কারণে তার হাসি বা কান্না দুয়েরই অর্থমূল্য ছিল।
নির্মাতারা ছবিতে তাকে অন্তর্ভুক্ত করে নিশ্চিত থাকতে পারতেন।

চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালীতে জন্মগ্রহন করেন মিনা পাল। পিতা শ্রীকৃষ্ণ দাস পাল এবং মা শ্রীমতি লাবণ্য প্রভা পাল। ১৯৬৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে আবির্ভাব তার। ১৯৬৪ সালের ‘সুতরাং’ ছবির পর তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর দেশের প্রায় সব পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন।

এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘হীরামন’ কাজী জহিরের ‘ময়নামতি’ [১৯৬৯], সিরাজুল ইসলামের ‘পারুলের সংসার’ [১৯৬৯],বাবুল চৌধুরীর ‘আগন্তুক’ [১৯৬৯],সুভাষ দত্তের ‘বিনিময়’ [১৯৭০], আমির হোসেনের ‘নীল আকাশের নিচে’ [১৯৭০], আমির হোসেনের ‘যে আগুণে পুড়ি [১৯৭০], বাবুল চৌধুরীর ‘আঁকাবাঁকা’ [১৯৭০], নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘দ্বীপ নেভে নাই’ [১৯৭০],নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘কখগঘঙ’ [১৯৭০], আলমগীর কুমকুমের ‘স্মৃতিটুকু থাক’ [১৯৭১], রুহুল আমিনের ‘নিজেরে হারায়ে খুঁজি’[১৯৭২],জহিরুল হকের‘রংবাজ’ [১৯৭৩], রুহুল আমিনের ‘বেঈমান’ [১৯৭৪], মাসুদ পারভেজের ‘মাসুদ রানা’ [১৯৭৪], মোস্তফা মেহমুদের ‘অবাক পৃথিবী’ [১৯৭৪], প্রমোদকরের ‘সুজনসখী’ [১৯৭৫], অশোক ঘোষ ‘মতিমহল’ [ ১৯৭৭], আবদুলতাহ আল মামুনের ‘সারেং বৌ’ [১৯৭৮], কাজী জহিরের ‘বধূবিদায়’ [১৯৭৮], শহিদুল হক খানের ‘কলমীলতা’ [১৯৮১], চাষী নজরুল ইসলামের ‘দেবদাস’ [১৯৮২]। এছাড়া আরও অনেক ছবিতে অভিনয় করেন।

তিনি আয়না নামের একটি ছবি পরিচালনাও করেছেন। এছাড়াও সম্পতি তিনি শুরু করেছিলেন সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘এই তুমি সেই তুমি’ চলচ্চিত্রের কাজ।

জীবনের অনেক ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে পার করেছেন এই অভিনেত্রী। ফিরিঙ্গি বাজারের কিশোরী মিনা পালের স্বপ্ন ছিল- ‘বড় হয়ে সাদা শাড়ি পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে মাস্টারি করবেন।’ কিন্তু ‘লাইট, ক্যামেরা-অ্যাকশন-কাটের’ পর ব্যক্তিজীবনে রাজনীতিতে নেমে জীবনের আরেক চলচ্চিত্রের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে।

রাজনীতি প্রসঙ্গে কবরী বলেছিলেন ‘আমি রাজনীতিতে কখনও অভিনয় করিনি, আবার অভিনয় জীবনেও কখনও রাজনীতিকে স্থান দিইনি। দুটি কাজই করেছি মানুষকে ভালোবেসে আর মানুষের ভালোবাসার জন্য। মানুষের পাশে থাকার জন্য।’ কবরীর এই মন্তব্যই বলে দেয়, কর্মে যতখানি নিপুণ ছিলেন তিনি, ঠিক ততখানি ছিলেন ভালোবাসায়ও।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ১৯ এপ্রিল পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি চলে যান তিনি। সেখান থেকে ভারতে পাড়ি জমান। সেই সময় রাজনৈতিক অঙ্গনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক না থাকলেও একজন শিল্পী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কলকাতা গিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে বিভিন্ন সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবারও চলচ্চিত্র জগতে মনোনিবেশ করেন কবরী। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এরপর।

কবরীর নায়কেরা:
ষাট আর সত্তরের দশকে রাজ্জাক-কবরী জুটি ছিল দারুণ জনপ্রিয়। এ জুটির ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘স্মৃতিটুকু থাক’, ‘রংবাজ’, ‘বেঈমান’, ‘কাঁচকাটা হীরে’সহ অসংখ্য ছবি আছে, যা দর্শক-মন ছুঁয়েছে। একটি দারুণ ব্যাপার হলো- নায়ক উজ্জ্বল, সোহেল রানা, আলমগীর, ফারুক ও জাফর ইকবালের প্রথম ছবির নায়িকাও কবরী।

ফারুকের সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘সুজন সখী’ ও ‘সারেং বৌ’ ছবি দুটো করেও নাম কুড়িয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় ছবিটির জন্য তিনি পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কারও। এদিক থেকে কবরীর সঙ্গে অভিষেক হয়েছিল ছয় নায়কের।

আরও পড়ুন
Loading...